ইসলামে রোজার নির্দেশিকা

রমযান, নফল রোজা, অব্যাহতি ও ছুটে যাওয়া রোজার কাযা সম্পর্কে জানুন। এই নির্দেশিকা কুরআন ও সুন্নি হাদিসগ্রন্থের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। কিছু বিস্তারিত বিষয়ে স্বীকৃত সুন্নি মাযহাবগুলোর মতভেদ আছে এবং ব্যক্তিগত অবস্থার জন্য জ্ঞানী শিক্ষকের পরামর্শ প্রয়োজন হতে পারে। يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ হে মুমিনগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করো। — কুরআন ২:১৮৩

রোজার অর্থ ও উদ্দেশ্য

রোজা আল্লাহর ইবাদত: নিয়তের সঙ্গে একজন মুসলিম সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা ভঙ্গকারী বিষয় থেকে বিরত থাকেন। এটি তাকওয়া, ধৈর্য, কৃতজ্ঞতা ও সহমর্মিতা গড়ে তোলে। রোজা সততা, সদাচরণ এবং অন্যের অধিকার রক্ষারও শিক্ষা দেয়। রমযানের রোজা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। [১, ২, ৩]

উপরে ফিরুন

রমযানের রোজা কখন ফরজ হয়েছে

ইতিহাসের বিবরণে সাধারণত হিজরতের দ্বিতীয় বছর, আনুমানিক ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে রমযানের রোজা ফরজ হওয়ার কথা বলা হয়; এখানে উদ্ধৃত হাদিসে এই ঐতিহাসিক তারিখ নির্দিষ্ট করা নেই। কুরআনে কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার মাস রমযানের রোজা ফরজ করা হয়েছে। [১] একটি সহিহ বর্ণনায় আগের আশুরার বাধ্যবাধকতার পর রমযান ফরজ হওয়ার কথা এসেছে। [২৯] স্বীকৃত শুরু ও শেষ অনুসারে চান্দ্র মাস ২৯ বা ৩০ দিনের হতে পারে; বৈধ কারণ ছাড়া শুধু সতর্কতার নামে দিন যোগ করবেন না। [৪]

উপরে ফিরুন

কার ওপর রোজা ফরজ?

রমযানের রোজা সেই মুসলিমের ওপর ফরজ যিনি বালিগ, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন, সক্ষম ও মুকিম এবং যার এমন কোনো অবস্থা নেই যা রোজা সহিহ হতে বাধা দেয়। বালিগ হওয়ার আগে শিশুর ওপর রোজা ফরজ নয়; ক্ষতি ছাড়া সক্ষম হলে ধীরে ধীরে অভ্যাস করান। মানসিক সক্ষমতাহীন অবস্থায় ব্যক্তি দায়বদ্ধ নন; পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। অসুস্থতা, সফর ও অন্যান্য ক্ষেত্রে নিচে বর্ণিত ছাড় রয়েছে। [১, ৫]

উপরে ফিরুন

নিয়ত ও প্রতিদিনের রোজা

রমযান বা কাযার রোজা নির্দিষ্ট করে আল্লাহর জন্য অন্তরে নিয়ত করুন; মুখে নির্দিষ্ট বাক্য বলা জরুরি নয়। ফরজ রোজার ক্ষেত্রে সতর্ক পদ্ধতি হলো প্রতিদিনের জন্য রাতেই ফজরের আগে নিয়ত করা; নিয়তের বিস্তারিত বিষয়ে সুন্নি মাযহাবগুলোর স্বীকৃত আলোচনা আছে। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা ভঙ্গকারী বিষয় থেকে বিরত থাকুন এবং সালাত যথাসময়ে আদায় করুন। [৬]

উপরে ফিরুন

রমযানের শুরু ও শেষ

রমযানের চাঁদ প্রমাণিত হলে বা শাবান ৩০ দিন পূর্ণ হলে রমযান শুরু হয়। শাওয়ালের চাঁদ প্রমাণিত হলে বা রমযান ৩০ দিন পূর্ণ হলে তা শেষ হয়। মাস নির্ধারণ ও বিভিন্ন দিগন্তের বিষয়ে সুন্নি কর্তৃপক্ষের মতভেদ আছে। বৈধ আলেমদের মতভেদকে নিন্দা না করে সমাজের ঐক্য রক্ষায় বিশ্বস্ত স্থানীয় মুসলিম কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করুন। [৪]

উপরে ফিরুন

সাহরি ও রোজার শুরু

সুবহে সাদিকের আগের খাবার সাহরি মুস্তাহাব ও বরকতময়। সুবহে সাদিক হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি না নিয়ে সাহরি দেরিতে করুন। সূর্যোদয়ে নয়, সুবহে সাদিকে খাওয়া ও পান করা বন্ধ করুন। ফজরের আগের সতর্কতামূলক সময়সূচি আলাদা শরয়ি সীমা নয়। ফজরের সময় স্পষ্ট বোঝায় এমন নির্ভরযোগ্য স্থানীয় সময়সূচি ব্যবহার করুন। [১, ৭]

উপরে ফিরুন

সূর্যাস্তে ইফতার

আপনার অবস্থানে সূর্য ডুবে গেলে রোজার সময় শেষ হয়; সূর্যাস্ত নিশ্চিত করে দ্রুত ইফতার করুন। নবী ﷺ তাজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন; তা না থাকলে শুকনো খেজুর, আর খেজুর না থাকলে পানি দিয়ে। দোয়া করুন এবং অপচয় ও অতিরিক্ত ভোজন এড়িয়ে চলুন। [৮, ৯]

উপরে ফিরুন

রোজায় আচরণ

সারা বছরই সালাত, সততা ও আমানতদারি ফরজ। রমযানে বিশেষভাবে মিথ্যা, গীবত, গালাগাল ও অন্যায় থেকে বাঁচুন; কুরআন পড়ুন, আল্লাহর যিকির করুন ও সদকা দিন। গুনাহ রোজার সওয়াব কমাতে পারে এবং গুরুতর হতে পারে; কিন্তু প্রতিটি গুনাহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে রোজা বাতিল করে না। সওয়াবের ক্ষতি ও রোজা বাতিল হওয়া পৃথক বিষয়। [৩]

উপরে ফিরুন

কী কী রোজা ভঙ্গ করে?

স্পষ্ট উদাহরণের মধ্যে ইচ্ছাকৃত খাওয়া বা পান করা, রোজার সময় ইচ্ছাকৃত যৌনমিলন এবং হায়েয বা নিফাস শুরু হওয়া রয়েছে। অধিকাংশ আলেমের মতে ইচ্ছাকৃত বমি ঘটালে কাযা করতে হয়; অনিচ্ছাকৃত বমির বিধান আলাদা। অধিকাংশের মতে হস্তমৈথুনে ইচ্ছাকৃত বীর্যপাত রোজা ভঙ্গ করে; অন্য শারীরিক সংস্পর্শের বিস্তারিত বিধান ভিন্ন। সব পরিস্থিতিকে এক রকম ধরে নেবেন না। [১, ১০, ১১]

উপরে ফিরুন

ভুলে খাওয়া, বমি ও অনুমোদিত কাজ

ভুলে খেলে বা পান করলে মনে পড়ামাত্র থামুন এবং রোজা পূর্ণ করুন; রোজা সহিহ থাকবে। অনিচ্ছাকৃত বমিতে সাধারণত রোজা ভাঙে না। অনিচ্ছাকৃত স্বপ্নদোষে রোজা ভাঙে না; বীর্যপাতের পর সালাতের জন্য ফরজ গোসল করতে হবে। গোসল, মিসওয়াক ব্যবহার এবং ইচ্ছাকৃত পানি গিলে না ফেলে ধীরে কুলি ও নাকে পানি দেওয়া অনুমোদিত। শুধু ক্ষুধা বা তৃষ্ণায় রোজা ভাঙে না। [১০, ১২, ১৩]

উপরে ফিরুন

ওষুধ ও চিকিৎসা

প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বন্ধ করবেন না এবং নিজেকে ক্ষতির মুখে ফেলবেন না। রোজার সময় মুখে গিলে খাওয়া ওষুধ রোজা ভঙ্গ করে; বিশ্বস্ত চিকিৎসক নিরাপদ বিকল্প সময় বিবেচনা করতে পারেন। ইনহেলার, ইনজেকশন, ড্রপ ও চিকিৎসা-পদ্ধতির বিস্তারিত বিধান ও আলেমদের মত ভিন্ন। নিজের চিকিৎসার বিষয়ে চিকিৎসক ও জ্ঞানী সুন্নি শিক্ষকের কাছে জিজ্ঞেস করুন এবং জরুরি চিকিৎসা বিলম্ব করবেন না। বৈধ কারণে রোজা ভাঙলে কাযা বা ফিদইয়া পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। [১]

উপরে ফিরুন

হায়েয ও নিফাস

দিনের মধ্যে হায়েয বা নিফাস শুরু হলে রোজা শেষ হয়; এই অবস্থায় রোজা সহিহ নয়। নারী রমযানের পর ছুটে যাওয়া রোজার কাযা করবেন; হায়েযকালে ছুটে যাওয়া সালাতের কাযা করবেন না। ফজরের আগে রক্তস্রাব বন্ধ হয়ে তিনি রোজার নিয়ত করলে ফজরের পরে ফরজ গোসল করলেও রোজা সহিহ; সালাতের যথাসময়ে গোসল করা উচিত। ফজরের পর পবিত্রতা শুরু হলে বিস্তারিত বিধানে মতভেদ আছে এবং সেই দিনের কাযা করতে হবে। এই ছাড় গ্রহণ আনুগত্য, অন্যায় নয়। [১৩]

উপরে ফিরুন

গর্ভাবস্থা ও শিশুকে দুধ পান করানো

গর্ভবতী বা শিশুকে দুধ পান করানো নারী নিজের বা শিশুর ক্ষতির যুক্তিসংগত আশঙ্কা করলে রোজা ভাঙার ছাড় নিতে পারেন। বিশ্বস্ত চিকিৎসক ও জ্ঞানী সুন্নি শিক্ষকের পরামর্শ নিন। সক্ষম হলে ছুটে যাওয়া দিনগুলোর কাযা গুরুত্বপূর্ণ; বিশেষ অবস্থায় অতিরিক্ত দরিদ্রকে খাওয়ানো লাগবে কি না তা নিয়ে মাযহাবগুলোর মতভেদ আছে। একটি নিয়ম সব অবস্থার জন্য যথেষ্ট নয়। [১৪]

উপরে ফিরুন

সাময়িক ও দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা

সাময়িক অসুস্থতায় রোজায় রোগ বাড়া, আরোগ্য দেরি হওয়া বা ক্ষতির যুক্তিসংগত আশঙ্কা থাকলে, কিংবা বিলম্ব করা যায় না এমন চিকিৎসা প্রয়োজন হলে, রোজা ভেঙে সুস্থ হওয়ার পর দিনগুলোর কাযা করা যায়। গুরুতর ক্ষতি এড়াতে হবে। উন্নতির সম্ভাবনাহীন দীর্ঘস্থায়ী অবস্থায় প্রতিদিন একজন দরিদ্রকে খাওয়ানোর বিধান আলেমরা আলোচনা করেছেন; ব্যক্তিগত অবস্থা ও পরে সুস্থ হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ পরামর্শ দরকার। [১]

উপরে ফিরুন

বার্ধক্য ও স্থায়ী অক্ষমতা

যে বয়স্ক ব্যক্তি রোজা রাখতে অক্ষম এবং সক্ষমতা ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই, তিনি স্থায়ী অক্ষমতার আলেমদের বিধান অনুযায়ী রোজা না রেখে প্রতিদিন একজন দরিদ্রকে খাওয়াতে পারেন। খাদ্যের ধরন ও পরিমাণে স্বীকৃত মতভেদ আছে; নির্ভরযোগ্য স্থানীয় পরামর্শ নিন। নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করবেন না। [১, ১৫]

উপরে ফিরুন

সফর

শরিয়ত অনুযায়ী সফর হিসেবে গণ্য যাত্রায় ব্যক্তি রোজা না রেখে পরে কাযা করতে পারেন, অথবা ক্ষতি না হলে রোজা রাখতে পারেন। রোজায় কঠিন কষ্ট বা ক্ষতি হলে ছাড় গ্রহণ উত্তম; গুরুতর ক্ষতি এড়াতে রোজা ভাঙার প্রয়োজনও হতে পারে। এই উদ্দেশ্যে সফর কখন শুরু ও শেষ হয় তার সুন্নি আইনি বিস্তারিত আছে; বাড়িতে থেকে শুধু সফরের পরিকল্পনা করা সফরে থাকার সমান নয়। [১, ১৬]

উপরে ফিরুন

কঠিন কাজ ও গরম

কঠিন শারীরিক কাজ করেন এমন ব্যক্তি রোজার নিয়ত করে সময় পরিবর্তন, বিশ্রাম ও গরম কমানোর মতো যুক্তিসংগত ব্যবস্থা নেবেন। শুধু কাজের নামের কারণে রোজা ছাড়া দিন শুরু করার স্বয়ংক্রিয় অনুমতি হয় না। দিনের মধ্যে অনিবার্য অসহনীয় কষ্ট বা ক্ষতির বাস্তব ঝুঁকি দেখা দিলে ব্যক্তি প্রয়োজনমতো ক্ষতি প্রতিরোধ করে রোজা ভাঙতে এবং পরে সে দিনের কাযা করতে পারেন। নিজের অবস্থার উপযোগী পরামর্শ নিন। [১]

উপরে ফিরুন

ছুটে যাওয়া দিনের কাযা

সাময়িক বৈধ ওজর শেষ হলে অনুমোদিত দিনগুলোতে ছুটে যাওয়া রোজার কাযা করুন। দিনগুলো ধারাবাহিক বা আলাদা হতে পারে। সক্ষম হলে পরবর্তী রমযানের আগে শেষ করার চেষ্টা করুন। স্থায়ী অক্ষমতা একটি ওজর; এড়ানো যেত এমন বিলম্বের ফল নিয়ে মাযহাবগুলোর মতভেদ আছে। দিনের সংখ্যা জানা না থাকলে সতর্কভাবে সর্বোত্তম অনুমান করুন। দুই ঈদের দিনে রোজা রাখবেন না এবং তাশরিকের দিনের নিয়ম মানুন। [১, ১৩]

উপরে ফিরুন

কাযা, ফিদইয়া ও কাফফারা

কাযা মানে ছুটে যাওয়া দিনের পরিবর্তে এক দিন রোজা রাখা। ফিদইয়া হলো শরিয়তে স্বীকৃত অবস্থায় একজন দরিদ্রকে খাওয়ানো, যেমন স্থায়ী অক্ষমতার কিছু ক্ষেত্রে; কাযা করতে সক্ষম হলে এটি সহজ বিকল্প নয়। শর্ত পূরণ হলে রমযানের দিনে ইচ্ছাকৃত যৌনমিলনের জন্য পৃথক বড় কাফফারা আছে: একজন দাস মুক্ত করা, তা সম্ভব না হলে টানা দুই মাস রোজা রাখা, তাও সম্ভব না হলে ষাটজন দরিদ্রকে খাওয়ানো। প্রয়োগ ও অতিরিক্ত দায়িত্ব পরিস্থিতি ও মাযহাবের ওপর নির্ভর করে; যোগ্য শিক্ষকের পরামর্শ নিন। [১, ১৭]

উপরে ফিরুন

নফল রোজা

ফরজের অতিরিক্ত নফল রোজা একটি প্রস্তাবিত ইবাদত। নিজেকে ক্ষতি না করে বা কোনো কর্তব্য ও অন্যের অধিকার অবহেলা না করে সম্ভব হলে তা পূর্ণ করুন। মানত, কাফফারা বা কাযার রোজা সাধারণ নফল রোজা থেকে আলাদা। নফল রোজার নিয়ত ও ভঙ্গের বিস্তারিত বিষয়ে সুন্নি মাযহাবগুলোর মতভেদ আছে। [১৮]

উপরে ফিরুন

শাওয়ালের ছয় রোজা ও আইয়ামে বীয

শাওয়ালের ছয় রোজা হলো ঈদুল ফিতরের পর শাওয়াল মাসে ছয় দিন রোজা; ধারাবাহিক বা আলাদা রাখা যায়। রমযানের কাযার সঙ্গে এ রোজার ক্রম ও সওয়াবের বর্ণনা নিয়ে আলেমরা আলোচনা করেছেন। আইয়ামে বীয হলো প্রতি চান্দ্র মাসের তিন দিন, সাধারণত ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ। এটি শাওয়ালের ছয় রোজা থেকে ভিন্ন আমল। যিলহজের ১৩ তারিখ তাশরিকের দিন এবং নিচে বর্ণিত বিশেষ হাজির ছাড় ব্যতীত সাধারণত রোজা রাখা যায় না। [১৯, ২০]

উপরে ফিরুন

সোমবার, বৃহস্পতিবার ও মাসে তিন দিন

সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখা এবং প্রতি চান্দ্র মাসে তিন দিন রোজা রাখা মুস্তাহাব। মাসিক তিন দিনের জন্য আইয়ামে বীয বেছে নেওয়া যায়; অন্য তিন দিনেও সাধারণ আমল পূর্ণ হয়। ঈদের মতো নিষিদ্ধ দিন নিয়মিত রোজার দিনে পড়লেও শুধু সে কারণে রোজা রাখবেন না। [২০, ২১]

উপরে ফিরুন

আরাফার দিন

আরাফার দিন যিলহজের নয় তারিখ। হজ করছেন না এমন ব্যক্তির জন্য রোজা মুস্তাহাব; একটি হাদিসে দুই বছরের গুনাহ মোচনের কথা এসেছে। আলেমরা ব্যাখ্যা করেছেন, এতে বড় গুনাহ চালিয়ে যাওয়া বা অন্যের প্রাপ্য অধিকার অনাদায়ী রাখা বৈধ হয় না। আরাফাতে অবস্থানরত হাজির জন্য রোজা না রাখা নবী ﷺ-এর আমলের অনুসরণ এবং ইবাদত ও দোয়ায় সাহায্য করে। প্রতিষ্ঠিত তারিখে বিশ্বস্ত স্থানীয় কর্তৃপক্ষ অনুসরণ করুন। [২২, ২৩]

উপরে ফিরুন

তাসুআ, আশুরা ও মুহাররম

আশুরা মুহাররমের দশ তারিখ; এর সঙ্গে নয় তারিখ রোজা রাখা মুস্তাহাব। নবী ﷺ আশুরায় আগের বছরের গুনাহ মোচনের কথা বলেছেন এবং পরের বছর নয় তারিখেও রোজা রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। অনেক আলেমের মতে শুধু দশ তারিখের রোজা সহিহ; দিনটিকে একা বেছে নেওয়ার বিষয়ে মতভেদ আছে। রমযানের পর নফল রোজার উত্তম মাসগুলোর মধ্যে মুহাররম অন্যতম। [২২, ২৪]

উপরে ফিরুন

শাবান, দাউদের রোজা ও অন্যান্য দিন

নবী ﷺ শাবানে অনেক রোজা রাখতেন এবং রমযান ছাড়া অন্য কোনো মাস পূর্ণ রোজা রাখেননি। দাউদের রোজা হলো দায়িত্ব অবহেলা না করে সক্ষম হলে এক দিন পরপর রোজা। নিজ অবস্থা অনুযায়ী যিলহজের প্রথম নয় দিনে সৎকাজ ও রোজা মুস্তাহাব; আরাফায় হাজির বিধান ভিন্ন এবং দশ তারিখ ঈদুল আযহা, যেদিন রোজা নিষিদ্ধ। ক্ষতিকর বা দায়িত্ব অবহেলার কারণ হয় এমন নফল রোজা গ্রহণ করবেন না। [২৩, ২৮]

উপরে ফিরুন

যেসব দিনে রোজা নিষিদ্ধ বা অপছন্দনীয়

ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন রোজা নিষিদ্ধ। যিলহজের ১১, ১২ ও ১৩ তারিখ তাশরিকের দিন; সাধারণত এ দিনগুলোতে রোজা রাখা হয় না। তামাত্তু বা কিরান পালনকারী যে হাজি হাদি পাননি এবং ঈদের আগে প্রয়োজনীয় রোজা পূর্ণ করেননি, তাঁর জন্য একটি বিশেষ ছাড় বর্ণিত হয়েছে। শুধু শুক্রবার নফল রোজা বেছে নেওয়া অপছন্দনীয়, যদি না তা নিয়মিত রোজা বা স্বীকৃত কারণে মিলে যায় অথবা পাশের এক দিনও রোজা রাখা হয়; এটি ফরজ কাযার রোজার নিষেধ নয়। [২৫, ২৬]

উপরে ফিরুন

অমুসলিম দেশে রোজা

অমুসলিম দেশে বসবাস করার কারণে রোজার দায়িত্ব বদলে যায় না। আপনার অবস্থানের সুবহে সাদিক ও সূর্যাস্ত অনুসরণ করুন; অবস্থান, তারিখ ও ফজরের হিসাব বিবেচনাকারী নির্ভরযোগ্য স্থানীয় মসজিদ বা সময়সূচি ব্যবহার করুন। চাঁদ দেখার ঘোষণা বা সময়সূচি ভিন্ন হলে দূরবর্তী দেশের সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবহার না করে বিশ্বস্ত স্থানীয় মুসলিম কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নিন। [১]

উপরে ফিরুন

দীর্ঘ দিনের অঞ্চলে রোজা

যেখানে প্রতিদিন স্বাভাবিক সুবহে সাদিক ও সূর্যাস্ত ঘটে, সেখানে স্বীকৃত ক্ষতি ছাড়া সক্ষম হলে দিন দীর্ঘ হলেও সাধারণ নিয়ম স্থানীয় ওই দুই সময়ের মধ্যে রোজা রাখা। শুধু দীর্ঘ দিন হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মক্কা বা অন্য শহরের সময় অনুসরণ করা যায় না। অসুস্থতা বা ক্ষতির বাস্তব ঝুঁকি দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট ছাড় প্রযোজ্য এবং সক্ষম হলে দিনের কাযা করতে হবে। [১]

উপরে ফিরুন

স্বাভাবিক সূর্যসংকেতহীন অঞ্চল

মেরু অঞ্চলের অবস্থা ভিন্ন: কোনো ঋতুতে সূর্য অস্ত না যেতে, না উঠতে বা নির্ভরযোগ্য সুবহে সাদিকের লক্ষণ বোঝা না যেতে পারে। এসব অবস্থায় একটি অনুমানভিত্তিক সময়সূচি নির্বিচারে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। স্বাভাবিক লক্ষণ অনুপস্থিত হলে সুন্নি আলেমরা উপযুক্ত সময় অনুমানের পদ্ধতি ব্যবহার করেন এবং প্রয়োগে মতভেদ আছে। আপনার অঞ্চলের অবস্থা বোঝে এমন জ্ঞানী সুন্নি পরিষদ বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা নিন এবং বাস্তব লক্ষণ থাকলে তা ব্যবহার করুন। অস্বাভাবিক দীর্ঘ দিনের সালাতের সময় অনুমানের হাদিস তুলনামূলক যুক্তিতে ব্যবহৃত হয়; এটি সরাসরি মেরু অঞ্চলের রোজার সময়সূচি নির্ধারণকারী হাদিস নয়। [২৭]

উপরে ফিরুন

দৈনন্দিন বাস্তব পরিকল্পনা

স্থানীয় ফজর ও সূর্যাস্ত যাচাই করুন, রাতে ফরজ রোজার নিয়ত করুন, সাহরি করুন, রোজা ভঙ্গকারী বিষয় থেকে বিরত থাকুন এবং সালাত পড়ুন। সূর্যাস্ত নিশ্চিত করে ইফতার করুন, কাযার দিন লিখে রাখুন এবং সূর্যাস্ত ও ফজরের মধ্যে যথেষ্ট পানাহার করুন। উদ্বেগজনক উপসর্গ দেখা দিলে বা জরুরি চিকিৎসা লাগলে দ্রুত চিকিৎসা নিন এবং উপযুক্ত ছাড় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করুন।

উপরে ফিরুন

উৎস

[১] কুরআন: আল-বাকারা ২:১৮৩–১৮৭ ও ২:১৮৫। [২] সহিহ আল-বুখারি ৮; সহিহ মুসলিম ১৬। [৩] সহিহ আল-বুখারি ১৯০১, ১৯০৩ ও ১৮৯৬। [৪] সহিহ আল-বুখারি ১৯০০; সহিহ মুসলিম ১০৮১। [৫] সুনান আবু দাউদ ৪৪০৩। [৬] সুনান আবু দাউদ ২৪৫৪। [৭] সহিহ আল-বুখারি ১৯২৩। [৮] সহিহ আল-বুখারি ১৯৫৪। [৯] সুনান আবু দাউদ ২৩৫৬। [১০] সহিহ আল-বুখারি ১৯৩৩। [১১] সুনান আবু দাউদ ২৩৮০। [১২] সুনান আবু দাউদ ২৩৬৫–২৩৬৬; সহিহ আল-বুখারি, কিতাবুস সাওম, রোজায় ভেজা বা শুকনো মিসওয়াক ব্যবহারের অধ্যায়। [১৩] সহিহ মুসলিম ৩৩৫; সহিহ আল-বুখারি ১৯২৫–১৯২৬। [১৪] সুনান ইবন মাজাহ ১৬৬৭। [১৫] সহিহ আল-বুখারি ৪৫০৫। [১৬] সহিহ মুসলিম ১১২১; সহিহ আল-বুখারি ১৯৪৬। [১৭] সহিহ আল-বুখারি ১৯৩৬; সহিহ মুসলিম ১১১১। [১৮] সহিহ মুসলিম ১১৫৪। [১৯] সহিহ মুসলিম ১১৬৪। [২০] জামে আত-তিরমিযি ৭৬১। [২১] জামে আত-তিরমিযি ৭৪৭। [২২] সহিহ মুসলিম ১১৬২। [২৩] সহিহ আল-বুখারি ১৯৮৮। [২৪] সহিহ মুসলিম ১১৩৪ ও ১১৬৩। [২৫] সহিহ আল-বুখারি ১৯৯০ ও ১৯৯৭–১৯৯৮। [২৬] সহিহ মুসলিম ১১৪৪। [২৭] সহিহ মুসলিম ২৯৩৭। [২৮] সহিহ আল-বুখারি ১৯৬৯ ও ১৯৭৬; সুনান আন-নাসাঈ ২৩৭২। [২৯] সহিহ আল-বুখারি ২০০২। সংস্করণভেদে হাদিস নম্বর ভিন্ন হতে পারে।

উপরে ফিরুন