সুন্নতে মুয়াক্কাদা সালাতের নির্দেশিকা

পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাতের সঙ্গে সম্পর্কিত নিয়মিত নফল সালাত, তার সময় ও ফজিলত জানুন। এই নির্দেশিকায় প্রচলিত একটি সুন্নি পদ্ধতি দেখানো হয়েছে; কিছু বিবরণে স্বীকৃত মাযহাবগুলোর মতভেদ রয়েছে। ফরজ সালাত আগে আদায় করতে হবে।

কার সঙ্গে শিখবেন তা বেছে নিন

এখানে বহুল প্রচলিত একটি সুন্নি পদ্ধতি দেখানো হয়েছে। মাযহাবভেদে কিছু বিষয়ে পার্থক্য থাকতে পারে; নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী নামাজ আদায় করুন। ওজু ভঙ্গের কোনো কারণ না ঘটলে ওজু বহাল থাকে।

সালাতের নির্দেশিকা

নিয়মিত সুন্নত সালাত কী?

নিয়মিত সুন্নত সালাত বা রাওয়াতিব হলো নির্দিষ্ট ফরজ সালাতের আগে বা পরে আদায় করা নফল সালাত। সুন্নতে মুয়াক্কাদা অত্যন্ত গুরুত্বপ্রাপ্ত আমল; এটি পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ থেকে পৃথক এবং ফরজের বিকল্প নয়। সুন্নি মাযহাবগুলোর মধ্যে আইনগত শ্রেণিবিভাগ ও বিস্তারিত বিধানে ভিন্নতা রয়েছে।

উপরে ফিরুন

এর ফজিলত

আল্লাহ মুমিনদের ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর নৈকট্য লাভে উৎসাহিত করেছেন। নবী ﷺ এক দিন ও রাতে বারো রাকাত নফল সালাত আদায়কারী মুসলিমের জন্য জান্নাতে ঘরের সুসংবাদ দিয়েছেন। এটি সওয়াবের প্রতিশ্রুতি, ফরজ অবহেলার কারণ নয়। [১, ২]

উপরে ফিরুন

দৈনিক বারো রাকাত এক নজরে

ফজর: ফরজের আগে দুই রাকাত। যোহর: আগে চার, পরে দুই রাকাত। আসর: এই বারো রাকাতের মধ্যে নিয়মিত মুয়াক্কাদা সালাত নেই। মাগরিব: পরে দুই রাকাত। ইশা: পরে দুই রাকাত। মোট ২ + ৪ + ২ + ২ + ২ = ১২। এই নির্দেশিকায় যোহরের আগের চার রাকাত দুই রাকাত করে দুই সালাতে পড়ুন। আরেকটি সহিহ বর্ণনায় যোহরের আগে দুই রাকাতের কথা এসেছে; সুন্নি আলেমরা বর্ণনা ও শ্রেণিবিভাগ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। [২, ৩]

উপরে ফিরুন

ফজরের আগে

সুবহে সাদিক শুরু হওয়ার পর এবং ফরজ ফজরের আগে দুই রাকাত পড়ুন। এই সুন্নত বিশেষভাবে গুরুত্বপ্রাপ্ত। নবী ﷺ বলেছেন, এ দুই রাকাত দুনিয়া ও তার সবকিছুর চেয়ে উত্তম। মূল কাজ বাদ না দিয়ে ও তাড়াহুড়া না করে সংক্ষিপ্তভাবে পড়ুন। এটি ফজরের দুই রাকাত ফরজ থেকে পৃথক। [৪]

উপরে ফিরুন

যোহরের আগে ও পরে

যোহরের সময় শুরু হলে ফরজ যোহরের আগে দুই রাকাত করে দুই সালাতে চার রাকাত পড়ুন। ফরজের পর যোহরের সময় শেষ হওয়ার আগে আরও দুই রাকাত পড়ুন। কিছু বর্ণনায় যোহরের পর অতিরিক্ত সালাতও এসেছে; সেই অতিরিক্ত রাকাত এখানে দেখানো বারো রাকাতের বাইরে। [২, ৩]

উপরে ফিরুন

আসরের আগে

এই বারো রাকাতের তালিকায় আসরের আগে বা পরে কোনো নিয়মিত মুয়াক্কাদা সুন্নত নেই। নবী ﷺ-এর বর্ণিত একটি দোয়ায় ফরজ আসরের আগে চার রাকাত নফল পড়তে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে; তা আসরের আগে পড়ুন, পরে নয়। এর শ্রেণিবিভাগ নিয়মিত মুয়াক্কাদা রাওয়াতিব থেকে পৃথক। [৫]

উপরে ফিরুন

মাগরিবের পরে

ফরজ মাগরিবের পর এবং ইশার সময় শুরু হওয়ার আগে দুই রাকাত পড়ুন। এটি বারো রাকাতের অন্তর্ভুক্ত। আজান ও ইকামতের মাঝখানেও ইচ্ছুক ব্যক্তির সালাত পড়ার সাধারণ উৎসাহ রয়েছে; সেটি মাগরিবের পরের দুই রাকাত মুয়াক্কাদা থেকে পৃথক। [২, ৬]

উপরে ফিরুন

ইশার পরে

ফরজ ইশার পর তার সময়ের মধ্যে দুই রাকাত পড়ুন। এটি বারো রাকাতের অন্তর্ভুক্ত। বিতর পৃথক রাতের সালাত; এই বারো রাকাতের মধ্যে গণনা করা হয় না। [২]

উপরে ফিরুন

বিতর ও রাতের সালাত

বিতর ইশার পর থেকে সুবহে সাদিকের আগে পর্যন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপ্রাপ্ত রাতের সালাত। এটি বেজোড় রাকাতে রাতের সালাত শেষ করে; এক বা তিন রাকাত তার প্রচলিত রূপের অন্তর্ভুক্ত। এর আইনগত মর্যাদা ও কিছু পদ্ধতিতে সুন্নি মাযহাবগুলোর মতভেদ আছে; বিশ্বস্ত শিক্ষক বা মাযহাবের নির্দেশনা নিন। পরে জাগার আশা থাকলে রাতের শেষে বিতর উত্তম; নইলে ঘুমানোর আগেও পড়া যায়। [৭]

উপরে ফিরুন

সুন্নত সালাত আদায়ের পদ্ধতি

অন্য সালাতের মতো প্রস্তুতি নিন: পবিত্রতা অর্জন করুন, সামর্থ্য অনুযায়ী কিবলামুখী হন, যথাযথভাবে সতর ঢাকুন এবং অন্তরে নির্দিষ্ট নফল সালাতের নিয়ত করুন। স্বাভাবিক কিয়াম, কিরাত, রুকু, সিজদা, শেষ তাশাহহুদ ও সালামসহ দুই রাকাত পড়ুন। যোহরের আগের দ্বিতীয় জোড়ার জন্য নতুন দুই রাকাত শুরু করুন। স্থিরভাবে পড়ুন; মুখে নির্দিষ্ট নিয়তের বাক্য বলা ফরজ নয়। কাজ ও কথার জন্য সালাত নির্দেশিকা দেখুন। [৮]

উপরে ফিরুন

বাড়ি, জামাত ও ইকামত

সুবিধা হলে বাড়িতে নফল সালাত পড়তে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে; মসজিদেও পড়া যায়। ফরজ জামাতের ইকামত শুরু হলে নতুন নফল শুরু না করে ফরজে যোগ দিন। আগে থেকেই নফল পড়তে থাকলে কী করবেন সে বিষয়ে আপনার মাযহাবের নির্দেশনা অনুসরণ করুন। [৯, ১০]

উপরে ফিরুন

সময় ও ছুটে যাওয়া সালাত

ফরজের আগের সুন্নত সাধারণত ফরজের সময় শুরু হওয়ার পর এবং ফরজের আগে পড়া হয়; পরের সুন্নত ফরজের পরে ও তার সময়ের মধ্যে পড়া হয়। সুন্নত ছুটে গেলে তা আদৌ এবং কখন কাজা করা যাবে, বিশেষত নিষিদ্ধ সময়ের কাছাকাছি, এ নিয়ে আলেমদের মতভেদ আছে। ফজর ও যোহরের ছুটে যাওয়া সুন্নত সম্পর্কে দলিল রয়েছে। ফরজ বিলম্বিত না করে নিজের অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞানী সুন্নি শিক্ষককে জিজ্ঞাসা করুন। [১১, ১২]

উপরে ফিরুন

জুমার সালাত ও সফর

জুমার পর নফল সালাত সম্পর্কে সহিহ বর্ণনায় বাড়িতে দুই রাকাত এবং জুমার পর চার রাকাতের কথা এসেছে; সুন্নি আলেমরা স্বীকৃত বিভিন্নভাবে তা ব্যাখ্যা করেছেন। যোহরের তালিকাকে জুমার প্রতিটি বিধানের হুবহু বিকল্প মনে করবেন না। মুসাফির সফরের প্রতিষ্ঠিত রুখসত নিতে পারেন; ফজরের সুন্নত ও বিতর বিশেষ গুরুত্বপ্রাপ্ত। নিজের অবস্থায় বিশ্বস্ত শিক্ষকের পরামর্শ নিন। [১৩, ১৪]

উপরে ফিরুন

নিয়মিত অভ্যাস গড়া

ফরজ সালাত দিয়ে শুরু করুন এবং প্রয়োজনে ধীরে ধীরে নিয়মিত সুন্নত যোগ করুন। মনে করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন, দুই রাকাতের পদ্ধতি শিখুন এবং অযথা কষ্ট বা নফলকে ফরজ মনে না করে নিয়মিত হওয়ার চেষ্টা করুন। কোনোটি ছুটে গেলে পরের সুযোগে অভ্যাস চালিয়ে যান।

উপরে ফিরুন

সূত্র

[১] কুরআন: আল-বাকারা ২:২৩৮; আল-মুযযাম্মিল ৭৩:২০। [২] সহিহ মুসলিম ৭২৮a; জামি আত-তিরমিজি ৪১৫। [৩] সহিহ আল-বুখারি ১১৮২ ও ১১৬৯। [৪] সহিহ মুসলিম ৭২৫a। [৫] জামি আত-তিরমিজি ৪৩০। [৬] সহিহ আল-বুখারি ৬২৪। [৭] সহিহ মুসলিম ৭৪৯d ও ৭৫৫। [৮] সুনান আবু দাউদ ১২৯৫। [৯] সহিহ আল-বুখারি ৭৩১। [১০] সহিহ মুসলিম ৭১০a। [১১] সুনান আবু দাউদ ১২৬৭; সহিহ আল-বুখারি ১২৩৩। [১২] সহিহ আল-বুখারি ৫৮৬। [১৩] সহিহ আল-বুখারি ৯৩৭; সহিহ মুসলিম ৮৮১a। [১৪] সহিহ আল-বুখারি ১০৯৫; সহিহ মুসলিম ৬৮১ ও ৭২৪a। সংস্করণভেদে হাদিস নম্বর ভিন্ন হতে পারে।

উপরে ফিরুন